
বিশ্ব অর্থনীতি ও মুদ্রার বিনিময় হার সম্পর্কে জানার আগ্রহ আমাদের অনেকের মধ্যেই থাকে। কারণ, একটি দেশের মুদ্রার মান কেবলমাত্র সেই দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা নয়, বরং বৈশ্বিক বাণিজ্যিক পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। আজ আমরা জানবো পৃথিবীর সেই দেশগুলোর কথা, যাদের মুদ্রার মান সবচেয়ে কম এবং তার পেছনের কারণ। পাশাপাশি, আমরা আলোচনা করবো পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী মুদ্রাগুলো নিয়েও।
কোন দেশের টাকার মান সবচেয়ে কম
বিশ্বের মুদ্রার মান নির্ধারিত হয় মূলত এর মার্কেট এক্সচেঞ্জ রেটের ভিত্তিতে, বিশেষ করে মার্কিন ডলার (USD) এর সাথে তুলনা করে। যে মুদ্রার জন্য ১ USD কেনার জন্য সবচেয়ে বেশি ইউনিট লাগে, সেই মুদ্রার মান সবচেয়ে কম বলে বিবেচিত হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসের শুরুর তথ্য অনুযায়ী (যেমন ০২ ডিসেম্বর), লেবাননের পাউন্ড (Lebanese Pound – LBP) বিশ্বের সবচেয়ে কম মূল্যের মুদ্রা। এর এক্সচেঞ্জ রেট প্রায় ৮৯,৬০০ LBP প্রতি ১ USD, অর্থাৎ ১ LBP-এর মান মাত্র ০.০০০০১১ USD-এর কাছাকাছি।
নীচের টেবিলে শীর্ষ ৫ দুর্বল মুদ্রার বিনিময় হার দেখানো হলো (১ USD-এর বিপরীতে কত ইউনিট পাওয়া যায়—যত বেশি সংখ্যা, তত দুর্বল মুদ্রা)। BDT-কে তুলনার জন্য যোগ করা হয়েছে।
সংখ্যা, তত দুর্বল মুদ্রা)। BDT-কে তুলনার জন্য যোগ করা হয়েছে।
| দেশ ও মুদ্রা | ১ ডলারে কত টাকা পাওয়া যায় | বাংলাদেশ ১ টাকায় কত পাওয়া যায় |
|---|---|---|
| লেবানন (পাউন্ড) | ৮৯,৫০০ | ৭৪৩ LBP |
| ইরান (রিয়াল) | ৪২,০৮৭ | ৩৪৪ IRR |
| ভিয়েতনাম (ডং) | ২৬,০৪৫ | ২১৩ VND |
| লাওস (কিপ) | ২২,০০০ | ১৮০ LAK |
| ইন্দোনেশিয়া (রুপিয়া) | ১৬,৫৬০ | ১৩৫ IDR |
কেন এটি সবচেয়ে কম মূল্যের?
- অর্থনৈতিক সংকট: ২০১৯ সাল থেকে লেবানন অর্থনৈতিক ধস নেয়েছে। হাইপারইনফ্লেশন (১৫০-২০০% বার্ষিক), ব্যাঙ্কিং সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বিদেশী রিজার্ভের অভাবে এর মুদ্রা ৯৮% এরও বেশি মূল্য হারিয়েছে।
- ব্ল্যাক মার্কেট রেট: অফিসিয়াল রেট কৃত্রিমভাবে নিয়ন্ত্রিত হলেও, বাস্তবে রাস্তার বাজারে রেট ৯১,০০০ থেকে ১৫০,০০০ LBP/USD পর্যন্ত পৌঁছেছে।
- অন্যান্য কারণ: যুদ্ধ, দুর্নীতি এবং ডলারাইজেশন (দৈনন্দিন লেনদেনে USD ব্যবহার) এটিকে আরও দুর্বল করেছে।
কোন দেশের টাকার মান বেশি
যেখানে কিছু দেশের মুদ্রার মান অনেক কম, সেখানে কিছু দেশের মুদ্রার মান এতটাই বেশি যে তা বিশ্ব অর্থনীতির শীর্ষে অবস্থান করছে। এ ক্ষেত্রে কুয়েতি দিনার (KWD) বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী মুদ্রা। ১ কুয়েতি দিনারের মান ২০২৫ সালের হিসাবে প্রায় ৩.২৬ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি টাকায় এর মূল্য প্রায় ৪০০ টাকা।
এর পেছনের কারণ
- তেল রপ্তানির উচ্চ আয়:
কুয়েতের অর্থনীতি মূলত তেল রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল মজুদের দেশ হওয়ায় কুয়েত প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে। - মুদ্রার চাহিদা:
কুয়েতি দিনার আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ, যা মুদ্রার মান বাড়িয়ে দিয়েছে। - অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা:
কুয়েতের অর্থনীতি অত্যন্ত স্থিতিশীল। বৈদেশিক ঋণের হার কম এবং সরকারি নীতিমালা সুশৃঙ্খল, যা দিনারের মান বাড়াতে সহায়ক।
মুদ্রার মান নির্ধারণে মূল কারণসমূহ
মুদ্রার মান শুধু তার বিনিময় হারের ওপর নির্ভর করে না, বরং আরো অনেক উপাদানের ওপর নির্ভরশীল। চলুন মুদ্রার মান কম বা বেশি হওয়ার পেছনের কারণগুলো দেখি:
- ১. বাণিজ্য ভারসাম্য: যে দেশ বেশি রপ্তানি করে এবং কম আমদানি করে, সে দেশের মুদ্রার মান সাধারণত বেশি থাকে। কারণ, রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ বৃদ্ধি পায়।
- ২. বৈদেশিক ঋণ: বেশি ঋণগ্রস্ত দেশগুলো সাধারণত মুদ্রার মান কম পেয়ে থাকে। কারণ, ঋণের সুদ পরিশোধ করতে গিয়ে তাদের বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ কমে যায়।
- ৩. মুদ্রাস্ফীতি: উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির কারণে মুদ্রার ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। ফলে মুদ্রার মানও হ্রাস পায়।
- ৪. অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা: একটি দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা মুদ্রার মান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
- ৫. বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ: যে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেশি, সে দেশের মুদ্রার মান তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী থাকে।
শেষ কথা
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মুদ্রার মানের পার্থক্য আমাদের শেখায় যে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সঠিক নীতিমালা কতোটা গুরুত্বপূর্ণ। ভিয়েতনাম এবং ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলো এখনো অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে রয়েছে, যেখানে কুয়েতের মতো দেশ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির শীর্ষে অবস্থান করছে।
মুদ্রার মান কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি সেই দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক শক্তি, বাণিজ্যিক ভারসাম্য এবং বৈশ্বিক অবস্থানের প্রতিফলন। সুতরাং, দেশের উন্নয়নের জন্য অর্থনৈতিক পরিকল্পনা এবং রপ্তানিমুখী নীতি গ্রহণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আপনার যদি কখনো ইন্দোনেশিয়া বা ভিয়েতনাম ভ্রমণ করার সুযোগ হয়, তাহলে এই মুদ্রার পার্থক্য নিয়ে আপনার অভিজ্ঞতা অবশ্যই অন্যরকম হবে। অন্যদিকে, কুয়েতের অর্থনৈতিক শক্তি থেকে আমরা শিখতে পারি, কীভাবে একটি দেশের সঠিক অর্থনৈতিক পরিকল্পনা তাকে বৈশ্বিক মুদ্রাবাজারে নেতৃত্ব দিতে পারে।
তথ্যটি আপনার জ্ঞানের প্রসার ঘটালে, শেয়ার করে অন্যদের জানার সুযোগ দিন।



